Back  

প্রযুক্তির বিবরণ

প্রযুক্তির নাম :ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি: নিরাপদ, বিষমুক্ত ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের কৌশল

বিস্তারিত বিবরণ : 
ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি বলতে কি বুঝায়?
ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি বলতে ফল গাছে থাকা অবস্থায় একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা বয়সে বিশেষ ধরণের ব্যাগ দ্বারা ফলকে আবৃত করাকে বুঝায়। ব্যাগিং করার পর থেকে ফল সংগ্রহ করা পর্যন্ত গাছেই লাগানো থাকে ব্যাগটি।

ব্যাগিং করার উপযুক্ত সময়
প্রত্যেক ফলের জন্য ব্যাগিং করার সময় এশটি নির্দিষ্ট সময় আছে। যেমন আমের ক্ষেত্রে ব্যাগিং করা হয় গুটির বয়স ৪০-৫৫ দিন। এই সময়ে আম মার্বেল বা এরচেয়ে কিছুটা বড় আকারের হয়ে থাকে। তবে আমের নাবী জাত যেমন ফজলি, হাড়িভাঙ্গা এবং আশ্বিনা আমের ক্ষেত্রে গুটির বয়স ৬৫ দিন হলেও ব্যাগিং করা যাবে। ব্যাগিং করার পূর্বে অবশ্যই কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক নির্দেশিত মাত্রায় ভালভাবে মিশিয়ে শুধুমাত্র ফলে স্প্রে করতে হবে। ফল ভেজা অবস্থায় ব্যাগিং করা ঠিক নয়। আমের ক্ষেত্রে কমপক্ষে তিনটি স্প্রে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন প্রথমবার আম গাছে মুকুল আসার আনুমানিক ১৫-২০ দিন পূর্বে, দ্বিতীয়বার মুকুল আসার পর অর্থাৎ আমের মুকুল যখন ১০-১৫ সেমি লম্বা হবে তখন এবং আম যখন মটর দানারমতো হবে তখন একবার। সুতরাং এর পরপরই আমে স্প্রে করে ব্যাগিং করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনা
আমের বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিটি সবচেয়ে সফল ও সম্ভাবনাময়। যে সকল এলাকায় আম বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ হয় না শুধুমাত্র পারিবারিক চাহিদা পূরণে আম গাছ লাগানো হয় এবং এই সমস্ত গাছে সময়মত স্প্রে করা হয় না বা সেই ধরনের প্রচলন এখনও ঐ সব এলাকায় চালু হয়নি ফলে প্রতি বছরই তাদের গাছে আম ধরে কিন্তু পোকা ও রোগের কারণে অধিকাংশ আম নষ্ট হয়ে যায়। এদেশের যে সকল এলাকায় বৃষ্টিপাত বেশি হয় এবং দেরীতে পাকে সে সকল আমের জাতগুলো বিবর্ণ বা কালো রং ধারণ করতে দেখা যায় এবং মাছি পোকার আক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এছাড়াও যে সমস্ত বাগানে ঘন করে আম লাগানো হয়েছে এবং বর্তমানে গাছের ভিতরে সূর্যের আলো পৌছায় না সে সকল গাছে আমের মাছি পোকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যত ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে কোনটিতেই এই পোকাটি শতভাগ দমন করা সম্ভব নয় বরং আক্রমণের হার কিছুটা কমিয়ে রাখা যায়। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শতভাগ রোগ ও পোকামাকড় দমণ করা যায়। আম রপ্তানির জন্য ভাল মানসম্পন্ন, রঙিন ও রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ মুক্ত আম প্রয়োজন। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে এই তিন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব নয়। বিভিন্ন আম রপ্তানিকার দেশে বহুল পরিচিত ও ব্যবহৃত পদ্ধতি হচ্ছে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি দ্বারা ১০০% রোগ ও পোকামাকড় মুক্ত আম উৎপাদন করা সম্ভব। এছাড়াও ব্যাগিং করা আম সংগ্রহের পর ১০-১৪ দিন পর্যন্ত ঘরে রেখে খাওয়া যায়। সেই সাথে রঙিন, ভাল মানসম্পন্ন নিরাপদ আমও পাওয়া যায়। এদেশের মানুষ কার্বাইড, ফরমালিন আতংঙ্কে যখন দেশীয় মৌসুমি ফল খাওয়া থেকে প্রায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সে সময়েই এই প্রযুক্তিটি মানুষের হাতের নাগালে। যে কোন আম চাষী, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ ইচ্ছে করলেই এই প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে সুফল পেতে পারেন। অন্যদিকে খরচ কমানো যাবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার। প্রতি বছর কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের আমদানি বাবদ খরচ করতে হয় কোটি কোটি ডলার এবং ব্যবহার করা হয় অপকারী পোকাকে মারার জন্য কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উপকারী ও বন্ধুপোকাগুলোও মারা যায়। ফলে দেখা দিয়েছে পরাগায়নকারী পোকার ঘাটতি। পর্যাপ্ত ফল ধারণ হচ্ছে না অনেক পর পরাগী ফলের। বর্তমান সময়ে আম বাগানে স্প্রের পরিমান লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষেত্রবিশেষে ১৫-৬২ বার। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাগিং প্রযুক্তিতে ৭০-৯০ ভাগ স্প্রে খরচ কমানো সম্ভব।

ব্যাগিং প্রযুক্তির প্রধান সুবিধাগুলো হলো
নিরাপদ, বিষমুক্ত ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের একমাত্র উপায় শতভাগ রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণমুক্ত আম পাওয়া সম্ভব যে কোন জাতের আমকে রঙিন (হলুদ) করা যায় ফলে বাজারমূল্য বেড়ে যায় এবং আমের সংরক্ষণকাল বাড়ানো যায় (১০-১৪ দিন পর্যন্ত), যেটি রপ্তানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন বৈশিষ্ট্য

ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহারের নিয়মকানুন
1. সঠিক সময়ে (আমের বয়স ৪০-৫৫ দিন) ব্যাগিং করার জন্য সময়মত প্রয়োজনীয় ব্যাগ সংগ্রহ করা এবং প্রয়োজনীয় শ্রমিকের ব্যবস্থা করা। চেয়ার, টুল বা মই সঙ্গে থাকলে ভাল হয়।
2. *ব্যাগিং করার পূর্বে আমগুলিকে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করা (বিকেল বেলায় ব্যাগিং করতে চাইলে সকাল বেলায় স্প্রে করতে হবে অথবা ব্যাগিং করার কমপক্ষে ২ ঘন্টা পূর্বে স্প্রে করতে হবে। তবে স্প্রে করার পরের দিনও ব্যাগিং করা যাবে যদি বৃষ্টিপাত না হয়)
3. আম ভেজা অবস্থায় ব্যাগিং করা যাবে না অর্থাৎ রৌদ্রোজ্জল দিনে ব্যাগিং করা ভালো।
4. দুইটি আম একত্রে থাকলে একসাথে ব্যাগিং করা যাবে তবে বড় জাতের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে ব্যাগিং করতে হবে।
5. *আমের গায়ে মরা ও শুকনা আম, উপপত্র, মুকুলের অংশবিশেষ লেগে থাকলে বা ব্যাগিং করতে অসুবিধার সৃষ্টি করলে তা পরিষ্কার করতে হবে।
6. ব্যাগের উপরের অংশ দুইপার্শ হতে ভাঁজ করতে করতে মাঝ বরাবর আসতে হবে। এরপর সংযুক্ত তার দ্বারা ভালভাবে মুড়িয়ে দিতে হবে। কোন অবস্থায় যেন পানি বা অন্যকিছু প্রবেশ করতে না পারে।
7. ব্যাগ সংগ্রহ করার সময় হাতে কলমে ব্যাগিং করা দেখে নেওয়া ভাল।
8. *রঙিন আমের জন্য একস্তর বিশিষ্ট সাদা ব্যাগ এবং যে কোন আমের জন্য দুইস্তর বিশিষ্ট বাদামি রঙ এর ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে দুইস্তর যুক্ত বাদামি রঙ এর ব্যাগ যে কোন আমকে রঙিন অর্থাৎ হলুদ করতে পারে।

চিহ্নিত পয়েন্টগুলি অবশ্যই করতে হবে।
ব্যাগের ব্যবহার শেষ হলে সেটি পুড়িয়ে ফেলুন অথবা পানিতে ডুবিয়ে রেখে নষ্ঠ করুন। পরিবেশকে পরিছন্ন রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আর এই দায়িত্ব পালনে আমাদেরকেই সহযোগিতা করতে হবে। ফল বিজ্ঞানিরা আশা করেন, দেশের প্রত্যেকটি চাষী ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম উৎপাদন করবেন এবং দেশের সকল মানুষ নির্বিঘ্নে উপভোগ করবেন দেশী রসালো মৌসুমি ফল।


প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।
 
Back